জীবনী: জেমস ওয়াট

জেমস ওয়াট বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিলেন- এরকম একটা ধারণাই সাধারণভাবে চালু আছে। আসলে কিন্তু মোটেই তা নয়। বাষ্পের বৈশিষ্ট্য এবং গুনাগুন নিয়ে জেমস ওয়াটের নশো বছর আগে থেকেই বৈজ্ঞানিক এবং আবিষ্কার করা মাথা ঘামিয়ে আসছেন। আসলে জেমস ওয়াট যা করেছিলেন তা হলো বাষ্পীয় শক্তি নিয়ে তার পূর্বসূরীরা যেসব সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন সেগুলোকে বিস্তারিত ভাবে বিশ্লেষণ করে তাকে হাতেকলমে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা।

খ্রীষ্টের জন্মেরও একশো বছর আগে হিবেরা নামে এক গ্রীক দার্শনিক “এওলিফাইল” বা “এওলাসের বল” নামে এক অদ্ভুত খেলনার সাহায্যে বাষ্পের শক্তিকে কাজে লাগিয়েছিলেন। এই যন্ত্ররূপী খেলাটিতে ছিল ধাতুর তৈরি নিজের অক্ষের ওপর ঘুর্ননীয়মান একটি ফাঁপা গোলক এবং তার নিচে রাখা একটি পানির বড় কড়াই।

গোলকটির সাথে লাগানো থাকতো মুখ আটকানো সছিদ্র কয়েকটি টিউব। এবার কড়াই এর পানি আগুনে ফুটতে শুরু করলেই গোলকটি বাষ্পে ভরে উঠত এবং টিউবের ছিদ্র দিয়ে ঢোকা বাতাসের ওপর বাষ্পের চাপ পড়ে গোলকটি নিজের অক্ষের উপর ঘুরতে শুরু করত। বাষ্পশক্তি চালিত সম্ভবতঃ এই প্রথম যন্ত্রটি ষোড়শ শতাব্দীতে গবেষকদের মধ্যে খুবই কৌতূহল ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল।

পরের দু’শতাব্দী ধরেই পন্ডিতরা ফুটন্ত পানির বাষ্পের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনায় মেতে রইলেন। তারা লক্ষ্য করে দেখলেন যে, বাষ্প দিয়ে যদি কোন নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত ওপরে ঠেলে ওঠে কতটা উঠবে তা অবশ্যই নির্ভর করে বাইরের আবহাওয়া মন্ডলের চাপের ওপর।

এছাড়া আরো দেখলেন, বাষ্পকে কোন পাত্রে ঘনীভূত করলে সেখানে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয় এবং পানি এসে সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করে। এই দুটি বৈশিষ্ট্যের প্রথমটি ব্যবহার করে সলোমান দা কাউস বাষ্পীয় চাপ চালিত ফোয়ারা তৈরি করেছিলেন। একটি গোলাকার পাত্রে দুটি নল আটকানো থাকতো; তার মধ্যে প্রথমটি দিয়ে পানি ঢোকানো হত, এবং দ্বিতীয়টি দিয়ে উত্তপ্ত পাত্রের বাষ্পের চাপে ফিনকি দিয়ে পানি বেরোত।

আর বাষ্পের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটিকে কাজে লাগিয়ে ক্যাপ্টেন টমাস স্যাভেরি নামে একজন ইংরেজ সামরিক ইঞ্জিনিয়ার পাম্প তৈরি করে কর্ণিশ অঞ্চলের টিনের খনি থেকে পানি বার করার কাজে লাগালেন। স্যাভেরিকে নিয়ে এ সম্বন্ধে একটি ভাল কাহিনী চালু আছে। একদিন একটি সরাইখানায় এক বোতল কিয়ান্তি মদ পান করার পর খালি বোতলটি চুল্লিতে ফেলে দিয়ে উনি একটা পানি পাত্র আনিয়ে তাতে হাত ধুচ্ছিলেন।

এমন সময় তার নজরে পড়ল যে বোতলের পড়ে থাকা মোদটুকু বাষ্প হয়ে উঠেছে। হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় বোতলটি চুল্লি থেকে বার করে এনে সেটিকে উল্টো মুখ করে পানিতে ঢুকিয়ে দিলেন তিনি এবং অবাক হয়ে দেখলেন যে বোতলের বাষ্পটি ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোতলের মধ্যে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়ে পাত্রের পানি সেখানে গিয়ে ঢুকছে। এই সূত্রটি ধরে তৈরি হলো তার পাম্প।

দুটি বড় গোলাকার পাত্র রাখা হল আর একটিতে সঙ্গে বয়লার থেকে বাষ্প ঢোকানো হত। অপরটিতে ঢোকানো হত খনির পানি। এরপর বাষ্পের চাপে অন্য একটি নল পানি বাইরে ফেলে দেওয়া হত। কিন্তু এই প্রক্রিয়া বিশেষ কার্যকরী হয়ে ওঠেনি কারণ পাম্প করে যতটুকু পানি বের করা হত, তার চাইতে বেশি পানি খনিতে এসে ঢুকত।

পূর্বসূরীদের মত স্যাভেরিও বাষ্পের অসীম সম্ভাবনার কথা বুঝে উঠতে পারেনি। বাষ্পকে ঠিকমত প্রথম কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছিলেন টমাস নিউকোমেন (১৬৬৩-১৭১৯)। বাষ্পের সাহায্যে যন্ত্রের অংশবিশেষকে নড়িয়ে তার সাহায্যে অন্য যন্ত্রকে কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি- তার যন্ত্র ছিল পাম্প।

নিউকোমেনের ইঞ্জিনের তলে “চেম্বার” যুক্ত একটি খাড়া সিলিন্ডার থাকত, সিলিন্ডারটির ভেতরে থাকত একটি “পিষ্টন”। আলাদা একটি বয়লরে বাষ্প তৈরি করে তাকে পিষ্টনের নীচে নিয়ে আসা হত। পিষ্টনটি আবার আটকানো থাকতো একটি নিজের সমেত ঘূর্ণয়মান বীমের সঙ্গে। এই বীমটির সঙ্গে যে নব বা রডটি থাকত, সেটিই পাম্পটিকে চালু রাখত। প্রথমে সিলিন্ডারটির মধ্যে পাম্প ঢুকিয়ে দেওয়া হত।

সিলিন্ডারটিও তার ফলে একটু উঠে যেত। এবার পিষ্টন আর রাযের যুক্ত ওঠানামায় পাম্পটি কাজ করত। সিলিন্ডারের মধ্যেকার বাষ্পকে সিলিন্ডারের গায়ে ঠান্ডা জলের ফিনকি দিয়ে ঘনীভূত করে নীচের চেম্বারটিতে এক আংশিক শূন্যস্থান পূরণ করত। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই সময় সাপেক্ষ।



ঘণ্টায় ১৫৬ ফুট গভীরতা থেকে এই ইঞ্জিনে ৫০ গ্যালন (প্রায় ২৫০ লিটার) পানি তোলা যেত। ইঞ্জিনটি চালু রাখতে দুটি লোককে সবসময়ই ব্যস্ত থাকতে হত একজন সারাক্ষণ বয়লারের আগুনের দিকে নজর রাখত, অন্যজন পালা করে দুটি ভালভ খুলত আর বন্ধ করত একটি বাষ্পের অন্যটি ঠান্ডা পানির। নিউ কোমেনকেই প্রকৃতপক্ষে বাষ্পীয় শক্তির ব্যবহারের আদি পুরুষ বলা যায়।

কিন্তু তার সম্বন্ধে খুব বেশি জানতে পারা যায়নি। তখনকার দিনে আবিষ্কার বা উদ্ভাবককে প্রায় সবাই খুব অবিশ্বাসের চোখে দেখতেন তাই শ্রদ্ধার বদলে সন্দেহটাই তার বরাতে জুটত বেশি। প্রথম জীবনে নিউকোমেন ফুটন্ত কেটলির ঢাকনার ওঠানামা নিয়ে যে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন সেটাই পরবর্তীকালে বাষ্পচালিত যন্ত্রের আজীবন গবেষক জেমস ওয়াটের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে।

অনেকেই মনে করেন জেমস ওয়াটের রোমাঞ্চকর কাজকর্মকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যই এই কাহিনীটি চালু করা হয়েছিল। নিউকোমেন ছিল ডার্টমুখের এক কামার। স্যাভেরিও তার পাম্পের কিছু কিছু ব্যাপারে নিউকোমেনের পরামর্শ নিয়েছিলেন। এবং নিউকোমেও স্যাভেরির কাজ সম্বন্ধে খুব উৎসাহিত হয়ে ওঠে।

অবশেষে স্যাভেরির মৃত্যুর পর তার নেওয়া “পেটেন্ট” গুলির মালিক হয়েছিলেন। কোলি নামে তার এ কাজের মিস্ত্রি বন্ধুর তত্ত্বাবধানে পাম্পের ঐ ইঞ্জিনটি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি হতে থাকে। এরপর সুদীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে নিউকোমেনের এই “আগুনের যন্ত্রটিই” খনি থেকে পানি বার করবার একমাত্র উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

নিউকোমেন কিন্তু তার এই সৃষ্টির জন্য প্রায় কোন স্বীকৃতিই পাননি। এই বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার করার বেশিরভাগ কৃতিত্বই দেওয়া হয় জেমস ওয়াটকে। এই দাবির মধ্যে অবশ্য কিছুটা যুক্তি আছে কারণ এই বাষ্পচালিত ইঞ্জিনকে তার অতি সীমিত ক্ষমতার এমন এক উৎস যাকে অজস্র বিভিন্ন ধরনের কাজে লাগানো যায়।

তার বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের নকশা নিখুঁত রূপে পাওয়ার পরে পাম্পের শক্তিকে দিয়ে খনির পানি পাম্প করা, কলকারখানা যন্ত্রপাতি চালানো, ময়দার কল চালানো, সুড়ঙ্গ খোঁড়া, বাড়ি তৈরি করা, জাহাজে বা খনিতে সরানো, পাহাড় বা মরুভূমির উপর দিয়ে মালপত্র টেনে নিয়ে যাওয়া এসবই করানো সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু তা সত্বেও ওয়াট আসলে নিউকোমেনের নকশাটিকে উন্নততর করে তুলেছিলেন মাত্র, নিজে কিছু আবিষ্কার করেননি। ওয়াটের এই মাত্রাঅতিরিক্ত খ্যাতির জন্য মূলতঃ দায়ী একটি প্রচলিত জনপ্রিয় কাহিনী। শৈশবে তার মধ্যে তেমন কোন চোখের পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য ছিল না, বরং আসলে স্বভাবের জন্য ওর অভিভাবকরা ওকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।

একদিন চায়ের টেবিলে ওর কাকিমা জেমসকে তো দারুন বকাবকি করে বললেন জেমস তোমার মত কুঁড়ে ছেলে আমি দুটি দেখিনি। হয় পড়াশোনা কর না হয় একটা কাজ কর। গত এক ঘন্টা ঘরে দেখছি, তুমি কোন কথাবার্তা না বলে খালি ঐ কেটলির ঢাকনাটা খুলছ, আর বন্ধ করছ।

কখনো বা একটা কাপ আর কখনো বা একটা চামচ নিয়ে বাষ্পের উপর ধরছ, কি করে কেটলির নল দিয়ে বাষ্পটা বের হচ্ছে সেটা মন দিয়ে দেখছ, আর বাষ্প থেকে তৈরি হওয়া পানির ফোঁটা গুলি হয় গুনছ নয়তো ধরার চেষ্টা করছো। পরবর্তী কালের ভাষ্যকারেরা এই অতিরঞ্জিত কাহিনীর মধ্যে জেমস ওয়াটের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের লক্ষণ খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছেন।

আসলে কিন্তু নেহাৎ আকস্মিকভাবেই তার মনে বাষ্প নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছিল। উনি নানারকম যন্ত্রপাতি তৈরি করতেন; সৌভাগ্যক্রমে একবার গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তিনি কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কলেজের গবেষণাগারে একটি নিউকোমেনের ইঞ্জিনের মডেল তাকে সারাতে দেওয়া হয়েছিল। উনি দেখলেন যে, ইঞ্জিনটি সব যন্ত্রপাতি ঠিক থাকা সত্ত্বেও একবারে কয়েক মিনিটের বেশি সেটি চলছে না।

ব্যাপারটা ঘটছে সেটা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছিল না। হঠাৎ এক রবিবারের সকালে বেড়াতে বেড়াতে এমন একটা সমাধান তার মাথায় খেলে গেল, যাতে উনি হয়ে গেলেন “শিল্প বিপ্লবের” জনক। উনি বুঝতে পারলেন, ইঞ্জিনের পক্ষে বয়লারটি খুবই ছোট আর তাই ইঞ্জিনে অহেতুক বাষ্প নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধান এটাই। কম বাষ্প খরচ হবে। এমন একটি ইঞ্জিন তৈরি করা।



যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে। বিভিন্ন শ্রেনির সকল বিষয়ে সাজেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন। নতুন নতুন সব শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বি: দ্র: তোমার নিজের রচিত কবিতা, সাহিত্য বা যেকোনো শিক্ষামূলক লেখা পাঠিয়ে দাও এডুয়েটিক’র কাছে। এডুয়েটিক প্রকাশ করবে তোমার প্রিয় লেখাটি।

এগুলো দেখুন

জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও হাসপাতালর শল্যচিকিৎসকরা একবাক্যে স্বীকার করতেন যে, একটি রোগীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *