জীবনী: জর্জ বার্নার্ড শ

জীবনী: জর্জ বার্নার্ড শ প্রায় ছয ফুট লম্বা পাতলা চেহারা, পরনে আধময়লা প্যান্ট আর কোট। মাথায় সস্তা দামের টুপি। বাইশ তেইশ বছরের এক তরুণ। হাতে এক বান্ডিল কাগজ নিয়ে প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ান। অনেক পরিশ্রম করে একটা উপন্যাস লিখেছেন। তার মনের ইচ্ছে যদি কেউ তার উপন্যাস প্রকাশ করে।

এক একদিন এক একজনের কাছে যান তার আশার উদ্দেশ্যের কথা শুনেই অনেকে দরজা থেকেই তাকে ফিরিয়ে দেন। অনেকে দু-চারটে কথা বলেন, উৎসাহ দেন আরো লেখ। ছাপাবার জন্য এত ব্যস্ততা কিসের। কাউকে অনুরোধ করা যেন তার স্বভাববিরুদ্ধ। একদিন একজন পড়বার জন্য রেখে দেয়।

আশা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তরুণ। দুদিন পরে যেতেই পাণ্ডলিপি ফিরিয়ে দেন প্রকাশক। ছাপা হলে একটাও বই বিক্রি হবে নাআশায় ভেঙ্গে পড়েন তরুণ। তার ভাগ্যে লেখ হবার কোন আশা নেই। ছয় বছরে পাঁচখানা উপন্যাস লিখেছেন কিন্তু একটা উপন্যাস ছাপাবার মত প্রকাশক পাওয়া যায়নি।

৫০ জন প্রকাশক তার লেখা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছ। শেষে এমন অবস্থা হল লেখা পাঠাবার মত হাতে একটি পেনিও নেই। দুঃখে হতাশায় তিনি ঠিক করলেন, আর যাই করুন না কেন কোনদিন লেখক হবেন না। নিজের প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেননি তরুণ।

কিছুদিন পরে আবার শুরু করলেন লেখা, তবে এবার আর উপন্যাস নয় নাটক। আর এই নাটকই তাকে এনে দিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি। শেক্সপিয়ারের পরে যাকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতার পূজারী এই মহান মানুষটির নাম জর্জ বার্নার্ড শো।

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের শ-এর জন্ম। ডাবলিন শহরে পরিবারের ছিল খুবই খ্যাতি আর সম্মান। ১৮৫৬ সালের ২৬ শে জুলাই জন্ম হয় বার্নার্ড শ-এর। তারা ছিলেন দুই বোন এক ভাই। বানার্ডের বাবা ছিলেন জর্জ কার শ। মার নাম ছিল লুসিন্দা এলিজাবেথ।

বাবা ছিলেন হাসিখুশি প্রাণখোলা মানুষ। এক বন্ধুর সাথে ভাগে ময়দার কারবার ছিল তার। বন্ধুর প্রতারণায় কারবার নষ্ট হয়ে গেল। অনেক টাকা ক্ষতি হল। এরপর থেকেই শুরু হলো আর্থিক দুরবস্থা। শ- এর মা ছিলেন এক অসাধারণ গুণবতী মহিলা। শ-এর জীবনে মায়ের ভূমিকা বিশাল।

তার বড় হয়ে ওঠার পেছনে মায়ের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। লুসিন্দা মানুষ হয়েছিলেন তার এক বড়লোক পিসিমার কাছে। এই পিসিমা ছিলেন অত্যন্ত গৌঁড়া প্রকৃতির। খুব কড়া শাসনের মধ্যে মানুষ করতে লুসিন্দাকে। ঘরের বাইরে যাওয়ার উপায় ছিল না। ঘরেই পড়াশুনা গান-বাজনা শেখার ব্যবস্থা করা হল। পিয়ানো শিখতেন লুসিন্দা।

বন্দীদশার মধ্যে যখন হাঁপিয়ে উঠছিলেন তখন একদিন দেখা হল জর্জ কারের সঙ্গে। লুসিন্দা তখন কুড়ি বছরের তরুণী। জর্জ কার চল্লিশ বছরের যুবক। বিয়ে হয়ে গেল দুজনের। দরিদ্র স্বামীর ঘরে এসে মানিয়ে নিলেন লুসিন্দা। নিজে ছোটখাটো অনুষ্ঠানে গান করতেন, পিয়ানো বাজাতেন।

মায়ের সম্বন্ধে শ বলেছেন, “আমার মা ছিলেন সুন্দরের প্রতিমূর্তি। অনেক নামকরা শিল্পীর গান শুনেছি। কিন্তু মায়ের গানের মত এমন পবিত্র সৌন্দর্য কারো গানে খুঁজে পাইনি। তার গান শুনলে মনে হত গির্জার প্রার্থনা সংগীত। এক স্বর্গীয় সুষমা ফুটে উঠত তাতে। মা মানুষ হয়েছিলেন কড়া শাসনের মধ্যে।

তাই তিনি আমাদের দিয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা। আজ আমি যে পৃথিবী বিখ্যাত বার্নার্ড শ হতে পেরেছি তার জন্য সবচেয়ে বেশি ঋণী সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ আমার মায়ের কাছে।” দশ বছর বয়সে সানিকে (শ-এর ছেলেবেলের নাম ছিল সানি) ভর্তি করে দেওয়া হলো ডাবলিনের কনেকসানাল স্কুলে।

এর আগে বাড়িতেই পড়াশুনা শুরু হয়েছে হয়ে গিয়েছিল। একজন শিক্ষার্থীর কাছে পড়তেন, সাহিত্য ইতিহাস, অংক আর আমার কাছে শিখতেন পিয়ানো। নতুন স্কুলে কিছুদিন যাতায়াত করবার পরে হাপিয়ে উঠলেন সানি। স্কুলের আবহাওয়, বাঁধাধরা পড়াশুনা, পরীক্ষা দেওয়া তার ভালো লাগত না।

মাত্র ছ বছর বয়সেই শিশু পাঠ্য বইয়ের সীমানায় অতিক্রম করে জন স্টুয়ার্ট মিলের আত্মজীনী পড়ে ফেলেছিলেন। পাঠ্য বইয়ের জগত তাকে বেশি আকর্ষণ করত। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল সঙ্গীত। সংগীতের সুরের মধ্যে তিনি যেন নিজেকে খুঁজে পেতেন। স্কুলে পড়াশুনা হল না শ-র।



বাড়িতেই পড়াশুনা করতে আরম্ভ করলেন। সারাদিন শুধু পড়া আর পড়া। এই একাগ্রতা, পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সাথে মিশেছিল অনুরাগ আর মেধা। কিশোর বয়সেই তিনি সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শনের বহু করছিলেন শেক্সপিয়ারের নাটক। তখনই তিনি মনে মনে কল্পনা করতেন একদিন তিনিও শেক্সপীরের মতো মস্ত বড় নাট্যকার হবেন।

কিন্তু আচমকা সংসারের নেমে এলো বিপর্যয়। তার বাবা বড়লোক ছিলেন না। ব্যবসা করে যা আয় করতেন তাতে মোটামুটি সচলভাবে সংসার চলে যেত। কিন্তু হঠাৎ কারবারে মন্দ দেখা দিল। আয় বন্ধ হয়ে গেল। নিদারুণ অর্থকষ্ট প্রকট হয়ে উঠল। বাধ্য হয়ে শ-কে চাকরি নিতে হল। শ-এর বয়স তখন পনেরো।

এক জমির দালালের অফিসে মাসে ১৮ শিলিং মাইনেতে চাকরি পেলেন। কিশোর বয়সে চাকরিতে ঢুকতে হল বলে কোন দুঃখ ছিল না। বাবার কাছে শিখেছিলেন সব কিছুকে সমানভাবে মানিয়ে নিতে। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলত তার লেখালেখি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।

তার কোন লেখাই ছাপা হত না। মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে সম্পাদকের কাছে চিঠি পাঠাতেন। তাতে বেশিরভাগই থাকতো অন্যের লেখার সমালোচনা। অবশেষে একদিন তার একটি চিঠি ছাপা হল। চিঠির বিষয় ছিল নিরীশ্বরবাদ। সেটাই তার জীবনের প্রথম মুদ্রিত লেখা। তখন শ-এর বয়স পনেরো।

শ ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ পরিশ্রমী। অল্প দিনের মধ্যেই অফিসের কাজে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে ক্যাশিয়ারের পথ পেয়ে গেলেন। পাঁচ বছর অফিসে কাজ করলেন। কিন্তু ক্রমশই তার মনে হচ্ছিল এই অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে তিনি যেন ফুরিয়ে যাচ্ছেন।

হারিয়ে যাচ্ছেন তার বড় হবার স্বপ্ন। জীবনে যদি কিছু করতে হয় তাকে যেতে হবে লন্ডন শহরে। যেখানে জীবন কাটিয়েছেন তার প্রিয় নাট্যকার শেক্সপিয়ার। চাকরিতে এস্তেফা দিলেন। বাবা আঘাত পেলেন। সংসারে যে নতুন করে অভাব দেখা দেবে, তার চেয়েও কথা লন্ডনে গিয়ে শ নিজের খরচ চালাবে কেমন করে!

ছেলেকে সাহায্য করবেন, তার তো সেই ক্ষমতাও নেই। অত কিছু ভাবার মত মনের অবস্থা নেই শ-এর। একদিন সামান্য কিছু জিনিস আর সম্বল করে বেরিয়ে পড়লেন লন্ডনের পথে। ১৮৭৬ সালে এপ্রিল মাসে তিনি এসে পৌঁছলেন লন্ডন শহরে। তখন তার মা লন্ডনে তার এক দিদির কাছে ছিলেন।

মায়ের কাছে এসে উঠলেন শ। ছেলের ইচ্ছার কথা শুনে তাকে নিরুৎসাহিত করলেন না। কয়েক মাস লেখালেখি করে কেটে গেল। কিন্তু লিখলেই তো পয়সা আসে না। বাধ্য হয়ে একটা চাকরি নিলেন। তখন সবেমাত্র টেলিফোন চালু হয়েছে। শ-এর কাজ হল টেলিফোনের প্রচার করা।

অল্প দিনের মধ্যেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল। শ-এর চাকরি জীবনও শেষ হয়ে গেল। ঠিক করলেন আর চাকরি নয়, এবার পুরোপুরি সাহিত্যকেই জীবনে বেছে নেবেন। শুরু হলো ছোট বড় পত্রিকা লেখা পাঠানো। দু-চারটি লেখা ছাপাও হল। সামান্য কিছু দক্ষিণাও পেলেন। সব অর্থ শ তুলে দিতেন মায়ের হাতে।

১৮৭৯-১৮৫ এই ছয় বছরে তিনি পরপর পাঁচ উপন্যাস লিখলেন, ইমম্যাচুরিটি, দি এরাশনালনট, লাভ এমং দি আর্টস্টস, ক্যাসেল বায়রনস প্রফেশন, এ্যান আনসোসাল সোস্যালিস্ট; কিন্তু একটিও উপন্যাস প্রকাশ করবার মত প্রকাশক পাওয়া গেল না।

এই সময় একটি পত্রিকার তরফে বলা হল তারা ক্যাসেল বায়রনস প্রফেশন উপন্যাসটি ধারকভাবে প্রকাশ করবে রাজি হলেন শ। এতে কিছু অর্থ পেলেন। কিন্তু আরও অর্থ চাই। মায়ের উপনির্ভরশীল জীবন আর ভালো লাগে না।

এই সময়কার কথা বলতে গিয়ে শ পরবর্তী জীবনে বলেছেন, “প্রকৃত শিল্পীরা বড় স্বার্থপর। তারা তাদের বৌদির দু বেলা মুঠো খাবার দেয় না। ছেলেমেয়েদের পোশাক দেয় না, বুড়ি মাকে ঝিয়ের মত খাটিয়ে মারে। তবু তারা নিজের শিল্প ছাড়া কোন কাজ করে না।” এই সময় বাবা মারা গেলেন। বাবাকে খুব ভালবাসতেন শ।

এই মৃত্যু তার জীবনে বিরাট একটা আঘাত। কিন্তু থেমে থাকবার মানুষ তো নন শ। তাকে কিছু একটা করতেই হবে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গিয়ে নিয়মিত পড়াশুনা করতেন। একদিন তার হাতে এল কার্ল মার্কসের ক্যাপিটাল। এই বই পড়ার সাথে সাথে তার মনের মধ্যে এক নতুন জগতের দ্বার উন্মোচিত হল। তার মনে হল এই সমাজতন্ত্রই হল নতুন যুগের দিশারী।



যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে। বিভিন্ন শ্রেনির সকল বিষয়ে সাজেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন। নতুন নতুন সব শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বি: দ্র: তোমার নিজের রচিত কবিতা, সাহিত্য বা যেকোনো শিক্ষামূলক লেখা পাঠিয়ে দাও এডুয়েটিক’র কাছে। এডুয়েটিক প্রকাশ করবে তোমার প্রিয় লেখাটি।

এগুলো দেখুন

জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও হাসপাতালর শল্যচিকিৎসকরা একবাক্যে স্বীকার করতেন যে, একটি রোগীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *