জীবনী: আলেকজান্ডার ফ্লেমিং

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর জন্ম হয় ১৮৮১ সালে ৬ আগস্ট স্কটল্যান্ড এর অন্তর্গত লাভ ফিল্ড বলে এক পাহাড়ি গ্রামে। বাবা ছিলেন চাষ। আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। দারিদ্র্যের মধ্যেই ছেলেবেলা কাটে ফ্লেমিংয়ের। যখন তার সাত বছর বয়স, তখন বাবাকে হারান। অভাবের জন্য প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডিটুকুও শেষ করতে পারেননি।

যখন ফ্লেমিংয়ের বয়স চৌদ্দ, তার ভাইরা সকলে এসে বাসা বাঁধল লন্ডন শহরে। তাদের দেখাশুনার ভাঁড় ছিল এক বোনের উপর। কিছুদিন কাজের সন্ধানে ঘোরাঘুরি করবার পর ষোল বছর বয়সে এক জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি পেলেন ফ্রেমিং। অফিসে ফাইফরমাশ খাটার কাজ। কিছুদিন চাকরি করেই কেটে গেল। ফ্লেমিংয়ের এক চাচা ছিলেন নিঃসন্তান। হঠাৎ তিনি মারা গেলেন।

তার সব সম্পত্তি পেয়ে গেলেন ফ্লেমিং এর ভাইরা। আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের বড় ভাই টমের পরামর্শ মতে ফ্লেভিং জাহাজ কোম্পানি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হলেন। অন্য সকলের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও অসাধারণ মেধায় অল্প দিনেই সকলকে পেছনে ফেলে মেডিকেল স্কুলের শেষ পরীক্ষায় প্রথম হলেন ফ্লেমিং। তিনি সেন্ট মেরেজ হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে যোগ দিলেন।

১৯০৮ সালে ডাক্তারি শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন কারণ সেনাবাহিনীতে খেলাধুলার সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
কয়েক বছর সামরিক বাহিনীতে কাজ করবার পর ইউরোপ জুড়ে শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সে সময় ফ্লেমিং ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর ডাক্তার হিসেবে কাজ করছিলে। তিনি ব্যাকটেরিয়া নিয়ে যে গবেষণা করেছিলে, এখানেই প্রথম তার পরীক্ষা করবার সুযোগ পেলেন।

হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য সৈনিক এসে ভর্তি হচ্ছিল। তাদের অনেকেরই ক্ষত ব্যাকটেরিয়ার দূষিত হয়ে উঠেছিল। ফ্লেমিং লক্ষ্য করলেন, যে সব এন্টিসেপটিক ওষুধ চালু আছে তা কোন ভাবেই কার্যকরী হচ্ছে না— ক্ষত বেড়েই চলেছে। যদি খুব বেশি পরিমাণে এন্টিসেপটিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া কিছু পরিমাণে ধ্বংস হলেও দেহ কোষগুলি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

ফ্লেমিং উপলব্ধি করলেন দেহের স্বাভাবিক শক্তি একমাত্র এসব ব্যাকটেরিয়াগুলি প্রতিরোধ করতে পারে কিন্তু তার ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ।
১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হল। দু মাস পর ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন ফ্লেমিং। আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করবার মত কোন কিছুই খুঁজে পেলেন না। ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি সেন্ট ম্যারিজ মেডিক্যাল স্কুলে ব্যাকটেরিওলজির প্রফেসর হিসেবে যোগ দিলেন।

এখানে পুরোপুরিভাবে ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করলেন মানবদেহে কিছু নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে যা এই বহিরাগত জীবাণুদের প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু তার প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ পেলাম না। ১৯২১ সাল একদিন ল্যাবরেটরিতে বসে কাজ করছিলেন ফ্লেমিং। কয়েকদিন ধরেই তার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না।

সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। তিনি তখন প্লেটে জীবাণু কালচার নিয়ে কাজ করছিলেন হঠাৎ প্রচন্ড হাঁচি এল। নিজেকে সামলাতে পারলেন না ফ্লেমিং। প্লেটটা সরাবার আগেই নাক থেকে খানিকটা সর্দি এসে পড়ল প্লেটের উপর। পুরো জিনিসটা নষ্ট হয়ে গেল দেখে প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন একটা প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করলে। কাজ শেষ হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে গেলেন ফ্লেমিং।

পরদিন ল্যাবরেটরিতে ঢুকতেই টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখা প্লেটটার দিকে নজর পড়ল। ভাবলেন প্লেটটা ধুয়ে কাজ শুরু করবে। কিন্তু প্লেটটা তুলে ধরতেই চমকে উঠলেন। গতকাল প্লেট ভর্তি ছিল জীবাণু সেগুলো আর নেই। ভালো করে পরীক্ষা করতেই দেখলে সব জীবাণুগুলো মারা গিয়েছে। চমকে উঠলেন ফ্লেমিং। কিসের শক্তিতে নষ্ট হল এতগুলো জীবাণু।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল গতকাল খানিকটা সর্দি পড়েছিল প্লেটের উপর। তবে কি সর্দির মধ্যে এমন কোন উপাদান আছে যা এই জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করতে পার! পর পর কয়েকটা জীবাণু কালচার করা প্লেট টেনে নিয়ে তার উপর নাক ঝাড়লেন। দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবাণুগুলো নষ্ট হতে আরম্ভ করেছে। এই আবিষ্কারের উত্তেজনায় নানান ভাবে পরীক্ষা শুরু করলেন ফ্লেমিং।



দেখা গেল চোখের পানি, থুথুতেও জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষমতা আছে। দেহনির্গত এই প্রতিষেধক উপাদানটির নাম দিলেন লাইসোজাইম। লাইস অর্থ ধ্বংস করা, বিনষ্ট করা। জীবাণুকে ধ্বংস করে তাই এর নাম লাইসোজাইম। এই লাইসোজাইম সাধারণ জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করলেও অধিকতর শক্তিশালী জীবাণুগুলোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হল। তারপর আট বছর কেটে গেল।

একদিন কিছুটা আকস্মিকভাবেই ঝড়ো বাতাসে খোলা জানালা দিয়ে ল্যাবরেটরির বাগান থেকে কিছু ঘাস পাতা উড়ে এসে পরলো জীবাণু ভর্তি প্লেটের উপ। খানিক পরে কাজ করবার জন্য প্লেটগুলো টেনে নিতেই দেখলেন জীবাণুর কালচারের মধ্যে স্পষ্ট পরিবর্তন। মনে হল নিশ্চয়ই এই আগাছাগুলির মধ্যে এমন কিছু আছে যার জন্যে এই পরিবর্তন ঘটেছে।

এর আগে তিনি আগাছা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, এবার কি কারনে পরিবর্তন ঘটল। ভালো করে পরীক্ষা করতেই লক্ষ্য করলেন আগাছা গুলির উপর ছত্রাক জন্ম নিয়েছে। সেই ছত্রাগুলি চেঁচে নিয়ে জীবাণুর উপর দিতেই জীবনগুলি ধ্বংস হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন তার এতদিনে সাধনা অবশেষে সিদ্ধিলাভ করল। এই ছত্রাকগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম ছিল পেনিসিলিয়াম নোটেটাম।

তাই এর নাম দিলেন পেনিসিলিন। রসায়ন সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকার কারণে পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেও কিভাবে তাকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে ওষুধ হিসেবে প্রস্তুত করা যায় তার স্পষ্ট কোন ধারণা ফ্লেমিং করে উঠতে পারেননি। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পেনিসিলিনের উপযোগিতা তীব্রভাবে সকলে অনুভব করল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হওয়ায় ফ্লোরির নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী কিভাবে পেনিসিলিনকে ওষধে রূপান্তরিত করা যায় তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন।

ফ্লোরির সাথে ছিলেন রসায়নবিদ ড. চেইন। কয়েক মাসের প্রচেষ্টার পর তারা সামান্য পরিমাণে পেনিসিলিন তৈরি করতে সক্ষম হলেন। প্রথমে তারা কিছু জীবজন্তুর উপর পরীক্ষা করে আশাতীত ভালো ফল পেলেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন মানুষের উপর পরীক্ষা। আকস্মিকভাবে সুযোগ এসে গেল। একজন পুলিশ কর্মচারী মুখে সামান্য আঘাত পেয়েছিল, তাতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল তা দূষিত হয়ে রক্তের মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল।

ডাক্তাররা তার জীবনের সব আশা ত্যাগ করেছিল। ১৯৪১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রফেসর ফ্লোরি স্থির করলেন এই মৃত্যু পথযাত্রী মানুষটির উপরেই পরীক্ষা করবেন পেনিসিলিন। তাকে তিন ঘন্টা অন্তর অন্তর চারবার পেনিসিলিন দেওয়া হল। ২৪ ঘন্টা পর দেখা গেল যার আরোগ্য লাভের কোনো আশাযই ছিল না। সে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছে। এই ঘটনায় সকলেই উপলব্ধি করতে পারল চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কি যুগান্তকারী প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে পেনিসিলিন।

মানব কল্যাণে নিজের এই আবিষ্কারের ব্যাপক প্রয়োগ দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে উঠছিলেন ফ্লেমিং। মানুষের কলকোলাহলের চেয়ে প্রকৃতির নিঃসঙ্গথে থাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত। মাঝে মাঝে প্রিয়তমা পত্নী সারিনকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। সারিন শুধু যে তার স্ত্রী ছিলেন তাই নয়, ছিলেন তার যোগ্য সঙ্গিনী। ১৯৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজদরবারের তরফ থেকে তাকে নাইট উপাধি দেওয়া হল। ১৯৪৫ সাল তিনি আমেরিকায় গেলেন।

১৯৪৫ সালের শেষ দিকে তিনি ফরাসি গভর্নমেন্টের আমন্ত্রণে ফ্রান্সে গেলেন। সর্বত্র তিনি বিপুল সংবর্ধনা পেলেন। প্যারিসে থাকাকালীন সময়ে তিনি জানতে পারলেন এবছরে মানব কল্যাণে পেনিসিলিন আবিষ্কারের এবং তার সার্থক প্রয়োগের জন্য নোবেল প্রাইজ কমিটি চিকিৎসা বিদ্যালয়ে ফ্লেমি, ফ্লোরি ও ডক্টর চেইন কে একই সাথে নোবেল পুরস্কারের ভূষিত করেছেন।

এই পুরষ্কার পাওয়ার পর ফ্লেমিং কৌতুক করে বলেছিলেন, এই পুরস্কারটি ঈশ্বরের পাওয়া উচিত কারণ তিনি সব কিছু আকর্ষিক যোগাযোগ ঘটিয়েছেন। ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে তিনি আবার সেন্ড মেরি হাসপাতালের ব্যাকটেরিওলজির গবেষণায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। চার বছর পর তার স্ত্রী সারিন মারা যান।

এই মৃত্যুতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ফ্লেমিং। তার জীবনের এই বেদনার্ত মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়ালেন গ্রীক তরুণী আমালিয়া তরুকা। আমালিয়া ফ্লেমিংয়ের সাথে ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে গবেষণা করতেন। ১৯৫৩ সালে দুজনে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হলেন। কিন্তু এই সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী হল না। দুই বছর পর ১৯৫৫ সালে ৭৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ফ্লেমিং।



যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে। বিভিন্ন শ্রেনির সকল বিষয়ে সাজেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন। নতুন নতুন সব শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বি: দ্র: তোমার নিজের রচিত কবিতা, সাহিত্য বা যেকোনো শিক্ষামূলক লেখা পাঠিয়ে দাও এডুয়েটিক’র কাছে। এডুয়েটিক প্রকাশ করবে তোমার প্রিয় লেখাটি।

এগুলো দেখুন

জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও হাসপাতালর শল্যচিকিৎসকরা একবাক্যে স্বীকার করতেন যে, একটি রোগীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *