জীবনী: জগদীশচন্দ্র বসু

বিজ্ঞান তাপস আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বাড়ীখাল গ্রামে। তার বাবা ভগবানচন্দ্র ছিলেন ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। জগদীশচন্দ্র যে বাড়িতে থাকতেন, বাড়ির পাশ দিয়ে পদ্মার একটি শাখা নদী বের হয়ে গিয়েছিল।

জগদীশচন্দ্র এই নদীর ধারে বসে থাকতে খুবই ভালোবাসতেন। সমস্ত জীবনই তার নদীর প্রতি আকর্ষণ ছিল। তাই পরবর্তীকালে তিনি গঙ্গার উৎস সন্ধানে যাত্রা করেছিলেন। স্থানীয় স্কুলে পড়া শেষ হলে ভগবানচন্দ্র জগদীশকে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।

কিন্তু ইংরেজিতে আশানুরূপ উন্নতি না হাওয়ায় তিন মাস পর জগদীশচন্দ্র ভর্তি হলেন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। ছাত্র হিসাবে জগদীশচন্দ্র ছিলেন যেমন মেধাবী, পড়াশুনায় ছিলেন তেমনি গভীর অনুরাগ। ১৬ বছর বয়সে জগদীশচন্দ্র প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পরীক্ষায় পাশ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হলেন।

১৮৭৭ সালে তিনি এফ. এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করলেন। তিন বছর পর দ্বিতীয় বিভাগেই বিজ্ঞান বিভাগে বি-এ পাশ করলেন। ১৮৮০ সালে জগদীশচন্দ্র বিলাতের পথে যাত্রা করলেন। লন্ডনে গিয়ে ডাক্তারি পড়বার জন্যে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেন। কিন্তু মৃতদেহ কাটাকুটির সময় প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন।

শেষে ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে তিনি কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। অবশেষে ১৮৮৪ সালে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি-এস-সি ডিগ্রি নিয়ে ফিরে এলেন ভারতবর্ষে।

ভারতে ফিরে আসার আগে ইংল্যান্ডের পোস্ট মাস্টার জেনারেল ভারতের বড়লাট লর্ড রিপনের কাছে জগদীশচন্দ্র বসুর সম্বন্ধে চিঠি লিখে দিলেন। লর্ড রিপন তখন ছিলেন সিমলায়। তিনি বাংলার গভর্নরকে চিঠি লিখে দিলেন যাতে জগদীশচন্দ্রকে শিক্ষা বিভাগে কোন ভালো পথ দেওয়া যায়।

সেই সময় সাহেবদের ধারণা ছিল ভারতীয়রা বিজ্ঞান শিক্ষায় অনুপযুক্ত। সেই কারণে চাকরিতে নিয়োগের ব্যাপারে নানা অজুহাত সৃষ্টি করা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লর্ড রিপনের আদেশে তাকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করা হলো।

এই পদে ইংরেজ অধ্যাপকরা যে বেতন পেত, জগদীশচন্দ্রকে তার দুই তৃতীয়াংশ বেতন স্থির হল। আবার অস্থায়ী বলে ঐ বেতনের অর্ধেক হাতে দেওয়া হতো। এই ব্যবস্থাই জগদীশচন্দ্রের আত্মসম্মানে ঘা লাগল। ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে এই বৈষম্য দূর করবার জন্য তিনি প্রথমে প্রতিবাদ জানালেন।

বাঙ্গালী তরুন অধ্যাপকের এই প্রতিবাদে কেউ কোনো কর্ণপাত করল না। শেষে তিনি স্থির করলেন কোন বেতন নেবেন না। বেতন না নিলেও তিনি নিয়মিত ক্লাস নিতে আরম্ভ করলেন। ১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র অবলা দাসকে বিয়ে করলেন। অবলা দাস ছিলেন বিদূষী উচ্চশিক্ষিতা।

মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে কয়েক বছর ডাক্তারি পড়েছিলেন। যখন দুজনের বিয়ে হল তখন জগদীশ বসু কোন মাইনে নেন না। সংসারে অভাব অনটন। অধ্যাপনার এক বছরের মধ্যেই জগদীশচন্দ্র তার গবেষণাপত্র ইংল্যান্ডের রয়েল সোসাইটিতে পাঠালেন। অল্প দিনের মধ্যেই তা প্রকাশিত হলো।

রয়েল সোসাইটির তরফ থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বৃত্তি দেওয়া হলো। এছাড়া লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে D. Sc. উপাধি দিল। ইতিমধ্যে তিন বছর তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কলেজে অধ্যাপনা করে গেলেন। তার এই অসহযোগ আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

জগদীশচন্দ্রকে শুধু যে ইংরেজ অধ্যাপকের সমান বেতন দিতে স্বীকৃতি হল তার তিন বছরের সমস্ত প্রাপ্য অর্থ মিটিয়ে দেওয়া হল। এই অর্থে পিতার সমস্ত দেনা শোধ করলেন জগদীশচন্দ্র। গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াই জগদীশচন্দ্র ইলেকট্রিক রেডিয়েশন বিষয়ে গবেষণা করতেন।



তার প্রথম প্রবন্ধ ছিল, “বিদ্যুৎ উৎপাদক ইথার তরঙ্গের কম্পনের দিকে পরিবর্তন” এই প্রবন্ধটি তিনি এশিয়াটিক সোসাইটিতে পেশ করেছিলেন। এর পরের প্রবন্ধগুলি ইংল্যান্ডের ইলেকট্রিসিয়ান পত্রিকায় প্রকাশ করেন।

এই সময় জগদীশচন্দ্র বিনা তারে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কিভাবে পাঠানো যায় সেই বিষয়ে গবেষণা করেছিলেন, আমেরিকায় বিজ্ঞানী লজ, ইতালিতে মার্কনী। জগদীশচন্দ্র ছিলেন এ বিষয়ে অগ্রণী। ১৮৯৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন।

কলকাতার টাউন হলে সর্বসমক্ষে এই পরীক্ষা করেন। এরপরে তিনি বিনা তারে তার উদ্ভাসিত যন্ত্রের সাহায্যে নিজের বাসা থেকে এক মাইল দূরে কলেজে সংকেত আদান প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এই কাজ অসমাপ্ত রেখেই তিনি পশ্চিমে যাত্রা করলেন। ১৮৯৬ সালে তিনি এক বছরের ছুটির জন্য দরখাস্ত করলেন।

প্রথমে সম্মত না হলেও শেষ পর্যন্ত গভর্নর তাকে গবেষণার জন্য ইংল্যান্ডে যাবার অনুমতি দিলেন। Wirelcss telgraphy সম্বন্ধে তার আবিষ্কার ইংল্যান্ডের সাড়া পড়ে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে জগদীশচন্দ্র লিখেছেন, “একটি বিখ্যাত ইলেকট্রিক কোম্পানি আমার পরামর্শ মত কাজ করে Wirelcss telgraphy বিষয়ে প্রভূত উন্নতি করিয়াছেন আমি আর একটি নতুন পেপার লিখিয়াছি তাহাতে Practical Wirelcss telgraphy-র অনেক সুবিধা হইবে।”

অর্থনৈতিক কারণে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা ব্যাহত হয়েছিল। ইতিমধ্যে ১৮৯৬ সালে মার্কনী Wirelcss telgraphy-র প্রথম পেটেন্ট নিলেন। ব্রিটেনে গিয়ে অল্প দিনের মধ্যেই তিনি বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত হয়ে উঠলেন। ১৯১৩ সালে জগদীশচন্দ্র চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করবার সময় ছিল, কিন্তু তার চাকরির মেদ আরো দুই বছর বাড়ানো হল।

১৯১৫ সালে সুদীর্ঘ ৩১ বছর অধ্যাপনা করবার পর চাকরি জীবন থেকে অবসর নিলেন। চাকরি জীবন শেষ হলেও তার গবেষণা কাজ বন্ধ হল না। তিনি ইংল্যান্ডে থাকার সময় লন্ডনের রয়েল ইনস্টিটিউটের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দেখে তার মনে হয়েছিল ভারতবর্ষে যদি এই ধরনের একটি গবেষণাগার থাকলে ভারতীয়রা গবেষণার কাজে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

তিনি তার পরিচিত জনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন। এবার এই কাজে এগিয়ে এলেন দেশের বহু মানুষ। কাশিমবাজারের মহারাজা মণীচন্দ্রচন্দ্র নন্দী দুই লক্ষ টাকা দিলেন। এছাড়া বোম্বের দুই ব্যবসায়ী মিঃ এস আর বোমানজী দিলেন এক লক্ষ টাকা।

মিঃ মূলরাজ খাতা সোয়া লক্ষ টাকা দিলেন। তাছাড়া জগদীশচন্দ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে অর্থ সঞ্চয় করলেন, এইভাবে প্রায় ছয় লক্ষ টাকা সংগৃহীত হল। জগদীশ নিজের সমস্ত জীবনের উপার্জন পাঁচ লক্ষ টাকা দিলেন। সরকারের তরফ থেকে বার্ষিক অনুদান হিসেবে এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হল।

এবং জমি অধিগ্রহণ করার ব্যাপারে সাহায্য করা হল। অবশেষে ১৯১৭ সালে ৩০শে নভেম্বর জগদীশচন্দ্রের ৫৯তম জন্মদিনে প্রতিষ্ঠা হল বিজ্ঞান মন্দির। জগদীশচন্দ্রের স্বপ্নের এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান শুধু ভারতবর্ষ নয়, সমগ্র বিশ্বের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণাগার।

১৯২৮ সালের জগদীশচন্দ্র জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেবার জন্য জেনেভা গেলেন। জেনেভাতে অভূতপূর্ব সম্মান পেলেন জগদীশচন্দ্র। তার গবেষণা দেখে আইনস্টাইন মুগ্ধ বিস্ময়ে বলেছিলেন, জগদীশচন্দ্র পৃথিবী কে যে সব অমূল্য উপহার দিয়েছেন তার যেকোনো একটির জন্যই বিজয় স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।

পরিণত বয়সে তিনি বেরিয়ে পড়েন পদ্মার উৎস ও সন্ধানে। তার এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন অপূর্ব ভাষায় ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে বিজ্ঞানী আর সাহিত্যিক জগদীশ একাকার হয়ে গিয়েছেন। বাংলা গ্রন্থ আর লেখা হয়নি। বয়স বাড়বার সাথে সাথে মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়তেন জগদিশচন্দ্র।গবেষণার কাজ ছেড়ে দিলেও বসু বিজ্ঞান মন্দিরের কাজ নিয়মিত দেখাশুনা করতেন।

মাঝে মাঝে দার্জিলিং যেতেন। জীবনের শেষ চার বছর কয়েক মাসের জন্য গিরিডিতে চলে যেতেন। ১৯৩৭ সালে তিনি তখন গিরিডিতে ছিলেন, বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কলকাতায় আসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, ২৩ শে নভেম্বর সকালের গোসলের সময় অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলেন, অল্পক্ষণের মধ্যেই তার হৃদয়স্পন্দন চিরদিনের মত স্তব্ধ হয়ে গেল। জগদীশচন্দ্রের কোন সন্তান ছিল না। তার ইচ্ছা অনুসারে তার স্ত্রী অবলা দাস সবকিছু বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে দান করে যান।



যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে। বিভিন্ন শ্রেনির সকল বিষয়ে সাজেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন। নতুন নতুন সব শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বি: দ্র: তোমার নিজের রচিত কবিতা, সাহিত্য বা যেকোনো শিক্ষামূলক লেখা পাঠিয়ে দাও এডুয়েটিক’র কাছে। এডুয়েটিক প্রকাশ করবে তোমার প্রিয় লেখাটি।

এগুলো দেখুন

জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও হাসপাতালর শল্যচিকিৎসকরা একবাক্যে স্বীকার করতেন যে, একটি রোগীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *