জীবনী: কার্ল হাইজেনবার্গ

জীবনী: কার্ল হাইজেনবার্গ কার্ল ভার্নার হাইজেনবার্গ জন্মগ্রহণ করেন ১৯০১ সালে জার্মানিতে। এটা এমন একটা সময় যখন ঠিক তার আগের বছর অর্থাৎ ১৯০০ সালে প্ল্যাঙ্কের ভাবনা নিয়ে জগৎ জোড়া হই-চই চলছে। কার্লের বাবার নাম অগাস্ট হাইজেনবার্গ। মায়ের নাম অ্যানি ওয়েকলেইন।

কার্লের বাবা ছিলেন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রিক সাহিত্যের অধ্যাপক। বাবার কাছ থেকে খুব ছোটবেলা থেকেই এই ভাষাটা কার্ল ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন। বিশ শতকের শুরু থেকে পদার্থবিজ্ঞানে নিউটনের ভাবনাগুলোতে নানা রকমের পরিবর্তন আসতে থাকলো। পদার্থের নানা আচরণ শুধু নিউটনকে সম্বল করে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।

দেখা দিচ্ছিল নানা অসম্পূর্ণতা। দরকার হয়ে পড়েছিল নতুন নতুন কথা বলার। সে সময় এ কাজে এগিয়ে এসেছিলেন বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী। তার মধ্যে কার্ল ভার্নার হাইজেনবার্গের নাম উল্লেখযোগ্যদের তালিকায় রয়েছে। কার্লের শৈশবকাল কেটেছে জার্মানিতে। সেখানকার একটি শহরে অবস্থিত ম্যাক্সিমিলান নামক স্কুলে তিনি ছোটবেলায় পড়াশোনা করেন।

১৯২০ সালে ছাত্র হিসেবে এলেন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়। ওখানে তখন ছিল তারকার মেলা, মধ্যমনি সামারফেল্ড। সমারফেল্ডের কাছে পদার্থবিদ্যা পড়েছেন হাইজেনবার্গ। সে কথা জীবনে তিনি কখনো ভোলেননি। ১৯২২-২৩ সালে তিনি এলেন গটিনগেনে। সেই গটিনগেন, যার ইতিহাস অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজের চেয়ে কিছু কম নয়।

সেখানে রয়েছে গণিতের রাজাধিরাজ হিলবার্ট, পদার্থবিদ জেমস ফ্রাঙ্ক আর ম্যাক্স বর্ন। গণিতের নোবেল নেই। তাই হিলবার্ট পাননি। পেয়েছেন ফ্রাঙ্ক, পেয়েছেন বর্ন। ১৯২৩ সালে মিউনিখ থেকে ডক্টরেট পেলেন হাইজেনবার্গ। ম্যাক্স বর্নের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলেন। ১৯২৪-২৫ এর শেষাশেষি আবার টিনগেনে ফিরে এলেন।

১৯২৬ সালে আবার কোপেনহেগেনেই তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার লেকচারার পদে যোগ দিলেন। এবার একটু আগের কথা বলে নেই। ১৯০০ সাল। জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স প্লাঙ্কে বের করলেন কালো বস্তুর বিকিরণে আলো কণার কোয়ান্টাম তত্ত্ব। ১৯০৫ সালে মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন একটা পরীক্ষা করে প্ল্যাঙ্কের তত্ত্বকে সমর্থন করলেন।

১৯১৩ সালে নীলস বোর বললেন, পরমাণুতে ইলেকট্রন কেমন করে থাকে। সব কথা মিলে নিউটনীয় ভাবনায় ধাক্কা দিল ভীষন। পদার্থবিজ্ঞানের নিউটন আচ্ছাদিত জগৎটা ভাবনার পুরনো খোলস ছেড়ে সম্পৃক্ত হয় কোয়ান্টাম ভাবনায়। তৈরি হল কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা। ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস।

বয়স ২৪ হয়েছে সবে। একটা গবেষণাপত্র বের হল তার নতুন সমীকরণ, নতুন গতিসূত্র। এমন সমীকরণে কথা বললেন হাইজেনবার্গ, প্রচলিত গণিতে যার সমাধান হচ্ছে না। প্রচলিত গণিত তিনি ব্যবহারও করেননি। এমন নতুন চেহারার বিষয়, যা কিনা নিউটনের আশেপাশেও যায় না, তা বুঝতে পারলেন খুব কম মানুষ।

১৯২৭ সাল। কোপেনহেগেনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইজেনবার্গের মাত্র এক বছর বয়স হয়েছে চাকরির। এই সময় একটা ডাক পেলেন তিনি লিপৎজিগ থেকে। মাত্র ২৪ বছর বয়সে পূর্ণ অধ্যাপক পদে যোগ দিলেন হাইজেনবার্গ। ডাক কি তিনি এমনি এমনি পেয়েছিলেন? কয়েকজন বিখ্যাত মানুষের সাথে কাজ করেছিলেন বলে হয়তো তার খানিকটা সুবিধা হয়েছিল।

কিন্তু পাশাপাশি নিজেও পেপার বের করে জগতের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন। আরও একটি কান্ড ঘটলো এক বছর পর। অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী শ্রয়ডিঙ্গার লিখলেন আরও একটি নতুন সমীকরণ। সোজাসুজি দেখলে হাজেমবার্গের সমীকরণ আর শ্রয়ডিঙ্গারের সমীকরণ কোন মিল নেই।

অন্য এক প্রতিভা ভন নিউম্যান, হিসেবে কষে দিখিয়ে দিলেন, হাইজেনবার্গ আর শ্রয়ডিঙ্গার আলাদা চেহারায় একই কথা বলেছেন। পদার্থবিদ্যায় তৈরি হল একটা নতুন শাখা, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার স্রষ্টা হাইজেনবার্গ। শ্রয়ডিঙ্গার নাম দিয়েছিলেন অন্য তরঙ্গ বলবিদ্যা।



এসব কথার মানে বুঝতে নোবেল কমিটির সময় লাগেনি। ১৯৩২ সালে তাই নোবেল পেলেন ৩১ বছরের যুবক হাইজেনবার্গ। ১৯৩৩ সালে শ্রয়ডিঙ্গার। কোয়ান্টাম বিদ্যা না হয় তৈরি হলো। নিউটনের সূত্র তাই বলে মানবে না কেন? উত্তর খুঁজছিলেন হাইজেনবার্গ নিজেই। উত্তর তিনি পেয়েও গেলেন।

১৯২৭ সালের ২৭ পাতার আরও একটা পেপার লিখলেন। নিউটনের গতিসূত্রকে একবার খতিয়ে দেখতে চাইলেন। নিউটন বলেছেন কোন একটা বস্তুর ওপর কী কী বল কাজ করছে জানা থাকলে বস্তুটির গতিপথ বের করা মোটেই অসম্ভব নয়। আর গতিপথ তো নানা সময় একটা বস্তুর অবস্থানও নির্দেশ করে।

অবস্থান জানতে চাইলে আবার জানতে হবে গতিবেগ।ফলে ঠিকঠাক ‘গতিপথ’ বলতে চাইলে ‘গতিবেগ’ ও ‘অবস্থান’ দুই জানা দরকার। হাইজেনবার্গ ১৯২৭ সালের পেপারে বললেন, কোন বস্তুর ‘গতিবেগ’ ও ‘অবস্থান’ একসাথে বের করা অসম্ভব। একটা পরমাণুর ভেতরে যে কোন ইলেক্ট্রনের কথাই ধরা যাক, ‘গতিবেগ’ জানতে চাইলে ‘অবস্থান’ হবে না।

‘অবস্থান’ জানতে গিয়ে ‘গতিবেগ’ জানা হয়ে উঠবে না। গ্রহ নক্ষত্র বিশাল ভারী। নিউটনের সূত্র তাই সে ক্ষেত্রে খাপ খায়। কিন্তু পরমাণুর জগতে এটা অচল। আরও বলেছিলেন হাইজেনবার্গ। ‘অবস্থান’ মাপতে চাইলে চাই ছোট মাপের তরঙ্গ। কিন্তু তখন গতিবেগ মাপা যাবে না।

‘গতিবেগ’ চাইলে দরকার বড় মাপের তরঙ্গ। তখন আবার অবস্থান জানা যায় না। এর নাম হাইজেনবার্গ দিলেন ‘অনিশ্চয়তা সূত্র’। যদিও এই সূত্র কথাই সবাই বেশি জানে, তবু হাইজেনবার্গ কিন্তু আগের কাজের জন্য নোবেল লাভ করেছিলেন।

অনেক আগে কোয়ান্টাম ভাবনার গোড়াপত্তন করেছিলেন প্ল্যাঙ্ক আর আইনস্টাইন। তারা দুজনেই হাইজেনবার্গের ভাবনাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। সন্দেহ ছিল শ্রয়ডিঙ্গারেরও ।তবু হাইজেনবার্গকে নাকচ করা যায়নি আজও। ১৯২৯ সালে বক্তৃতা দিতে আমেরিক, জাপান আর ভারতে এসেছিলেন হাইজেনবার্গ।

এক যুগ কাটল। ১৯৪১ সাল। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদ পেলেন তিনি। কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্স এর অধিকর্তা হলেন। শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। একসময় আমেরিকা বাহিনী আরো অনেকের সাথে হাইজেনবার্গকে বন্দী করে নিয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে তিনি মুক্ত হন। মুক্তি পাবার পর পুর উদ্যমে গটিনগেনে ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্স করা হয়।

কারো কারো মতে হাইজেনবার্গ ছিলেন নাৎসি বাহিনীর সমর্থক কথাটা বোধ হয় সঠিক নয়। তিনি সব সময় জার্মানিতে বিজ্ঞান গবেষণার ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাইছিলেন। তাই বলে হিটলার বাহিনীকে তিনি কখনো সমর্থন করেননি। আইনস্টাইন ইহুদি বলে তাকে অন্যায়ের শিকার হতে হবে এটা কিছুতেই মেনে নিলেন না হাইজেনবার্গ।

ফলে যা হবার হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে সমারফেল্ডের শূন্য পদে যোগ্যতম হওয়া সত্ত্বেও জায়গা পাননি তিনি। হিটলারের রোমা তৈরীর পরিকল্পনায় কাজ করতেন হাইজেনবার্গ। এই নিয়ে অনেকের ক্ষোভ রয়েছে। তিনি বলেছেন, অন্যদিকে হিটলারের মতিগতি ঘুরিয়ে দিতে ইচ্ছে করেই এই বোমা প্রকল্পর দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

১৯৫৭ সাল থেকে তিনি প্লাজমা পদার্থবিদ্যা গবেষণার দিকে নজর দেন। জেনোর আন্তর্জাতিক পরমাণু পদার্থবিদ্যা প্রতিষ্ঠানের সাথে ঐ সময় তার নিবিড় যোগাযোগ হয়েছিল। বহু বছর তিনি এই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান নীতি নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ছিলেন।

বহু বিদ্যালয় থাকে সম্মানিত উপাধি দিয়েছে। খুব ভালো রাগসংগীত দখলে ছিল তার। চমৎকার পিয়ানো বাজাতেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এই দার্শনিক বিজ্ঞানীকে আমরা কিছুতেই ভুলতে পারব না। এই মহান বিজ্ঞানী ১৯৭৬ সালে ৭৫ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে যান মৃত্যুর ওপারে।



যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে। বিভিন্ন শ্রেনির সকল বিষয়ে সাজেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন। নতুন নতুন সব শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বি: দ্র: তোমার নিজের রচিত কবিতা, সাহিত্য বা যেকোনো শিক্ষামূলক লেখা পাঠিয়ে দাও এডুয়েটিক’র কাছে। এডুয়েটিক প্রকাশ করবে তোমার প্রিয় লেখাটি।

এগুলো দেখুন

জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও হাসপাতালর শল্যচিকিৎসকরা একবাক্যে স্বীকার করতেন যে, একটি রোগীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *