জীবনী: এডওয়ার্ড জেনার

জীবনী: এডওয়ার্ড জেনার শীতের রাত, চারদিকে কনকনে ঠান্ডা। পথে ঘাটে একটি মানুষও নেই। অধিকাংশ মানুষই নেই। অধিকাংশ মানুষ ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে আগুন পোহাচ্ছে। যারা বাইরে গিয়েছিল সকলেই ঘরে ফেরার জন্য উদগ্রীব।

ইংল্যান্ডের এক আধা শহর বার্কলেতে থাকতেন এক তরুণ ডাক্তার। বয়সে তরুণ হলেও ডাক্তার হিসেবে ইতিমধ্যে চারদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। দূর দূরান্ত থেকে রোগী আসে তার কাছে। বহু দূরের এক রোগী দেখে বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল।

ঘোরার গাড়ি থেকে নামতেই ডাক্তার দেখলেন তার বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাকে ঢাকা এক মহিলা। কাছে এগিয়ে গেলেন। সামনে আসতেই মহিলাটি তার পায়ের সামনে বসে পড়ল, আমার ছেলেকে বাঁচান ডাক্তারবাবু। ডাক্তার তাড়াতাড়ি মহিলাটিকে তুলে ধরে বললেন, কোথায় আপনার ছেলে?

ছেলেকে বাড়িতে রেখে এসেছি ডাক্তারবাবু। আমার চার চারটি ছেলে আগে মারা গিয়ে এই শেষ সম্বল। সমস্ত দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন ডাক্তার। তবু মহিলাটির কাতর ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলেন না, তার সাথে বাড়িতে গেলেন। গলির শেষ প্রান্তে ছোট একটি ঘর, ঘরের মধ্যে প্রদীপ জ্বলছিল।

এক কোণায় বিছানার উপর শুয়েছিল ছোট একটি বাচ্চা। সারা গায়ে ঢাকা দেওয়া। ডাক্তার গায়ের ঢাকা খুলতেই চমকে উঠলেন। শিশুটির সমস্ত শরীর গুটি বসন্তে ভরে গিয়েছে। জ্বরে বেহুঁশ। ঔষধের বক্স নিয়ে শিশুটির পাশে সমস্ত রাত জেগে রইলেন। সামনে উদবেলিত উৎকণ্ঠা ভরা চোখে চেয়ে আছে মহিলাটি।

এই ভয়ঙ্কর অসুখ আমার আগের চারটি সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে। একে আপনি বাঁচান। সমস্ত রাত জীবন আর মৃত্যুর লড়াই চলতে থাকে। অবশেষে পরাজিত হয় জীবন, মৃত্যু এসে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জীবন। মায়ের কান্নায় মুখর হয়ে উঠে চারদিক। রণক্লান্ত পরাজিত সৈনিকের মত বাড়ি ফিরে চলেন ডাক্তার।

তার বুকের মধ্যে বাজতে থাকে বিধবা মায়ের সন্তান হারবার কান্না। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। দীর্ঘক্ষণ পাথরের মূর্তির মত স্থির নিস্পন্দ হয়ে থাকেন। তারপর এক সময় উঠে দাঁড়ালে। পুত্রহারা মায়ের এই কান্না তাকে বন্ধ করতেই হবে। পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে হবে মৃত্যু রুপি এই ভয়ঙ্কর গুটি বসন্তকে।

শুরু হলো তার সাধনা। একদিন দুদিন নয়, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর। কোন ক্লান্তি নেই, অরসন্নতা নেই, এই সাধনায় তাকে সিদ্ধিলাভ করতেই হবে। অবশেষে সাফল্য এসে ধরা দিল সাধনার কাছে। জয়ী হল মানুষের সংগ্রাম। বসন্তের ভয়াবহ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল পৃথিবীর।

যে মানুষটির নিরলস সাধনায় পরাজিত হল ভয়াবহ ব্যাধি, তার নাম এডওয়ার্ড জেনার। ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মে ইংল্যান্ডে বার্কলে শহরে তার জন্ম। বাবা ছিলেন সেখানকার ধর্মযাজক। বার্কলের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। ধর্মপ্রচারের সাথে সাথে স্থানীয় মানুষের সুখে দুঃখে তিনি ছিলেন তাদের অকৃত্রিম বন্ধু।

গরিব দুঃখী মানুষের প্রতি তার ছিল সীমাহীন ভালোবাসা। পিতার এই মহৎ গুণ শিশুবেলা থেকেই জেনারের চরিত্রে প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু পিতার সান্নিধ্য দীর্ঘদিন পানি জেনার। যখন তার মাত্র পাঁচ বছর বয়স তখন বাবা মারা যান। তার সব ভার এসে পড়ে দাদা রেভারেন্ড স্টিফেন জেনারের উপর।

দাদার স্নেহচ্ছায়াতেই বড় হয়ে উঠতে থাকেন জেনার। জেনার যেখানে থাকতেন সেই বার্কলের সংলগ্ন অঞ্চলে ছিল সবুজ মাঠ, গাছপালা, মাঝে মাঝে চাষের জমি, কোথাও গোচারণ ভূমি। চাষীরা চাষ করত, রাখাল ছেলেরা মাঠে গরু নিয়ে আসত।

ছেলেবেলা থেকেই এই উদার মুক্ত প্রকৃতি জেনারকে নেশার মতো আকর্ষণ করত, তিনি একা একা ঘুরে বেড়াতেন মাঠের ধারে গাছের তলায়। মনে হত তারা যেন সজীব পদার্থ। প্রতিটি গাছের পাতায় ছোট ছোট ঘাসের মধ্যে তিনি যেন প্রাণের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছেন। পাখির ডাক তার কলকাকলি মনে হত সংগীতের মূর্চ্ছনা।

প্রকৃতির মুখোমুখি হলেই তন্ময়তার গভীরে ডুব দিতেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেন, তার বৈচিত্র বৈশিষ্ট্য। যা কিছু দেখতেন জানতেন, বাড়ি ফিরে এসে খাতার পাতায় লিখে রাখতেন আর লিখতেন কবিতা, কবিতার প্রতি ছেলেবেলা থেকেই ছিল তার আকর্ষণ, পরিণত বয়সেও তিনি অবসর পেলেই কবিতা লিখতেন।



অন্তরে ছিলেন তিনি কবি, প্রকৃতিপ্রেমিক, কর্মে বিজ্ঞানী চিকিৎসক। ভর্তি হলেন স্থানীয় স্কুলে। এই সময় দেখতে অসুস্থ মানুষের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা। তার মনে হত বড় হয়ে এই কষ্ট দুঃখ তিনি দূর করবেন। স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই মনস্থির করলেন তিনি ডাক্তারি পড়বেন।

সেই সময় চিকিৎসা ক্ষেত্রে শিক্ষা পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন করতে চাইলে তাকে কোন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকের কাছে ছাত্র হিসেবে কাজ করতে হত। গুরুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থেকে তারা হাতে কলমে কাজ শিখত। বার্কলেতে কোনো প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার ছিল না। জেনার এলেন লন্ডনে।

সেই সময় লন্ডনের সবচেয়ে খ্যাতিমান ডাক্তার ছিলেন জন হান্টার। তার কাছে ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলেন। অল্পদিনের মধ্যেই হান্টার জেনারের একাগ্রতা, নিষ্ঠা, সাধনার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তার কাছে ছাত্র হিসেবে কাজ করলেন।

অবশেষে ১৭৭৩ সালের ২৪ বছর বয়সের ডাক্তার হান্টারের কাছে চিকিৎসার পাঠ শেষ করে বার্কলেতে ফিরে এলেন জেনার। স্থির করলেন এখানেই তার চিকিৎসার পেশা শুরু করবেন। চিকিৎসক হিসেবে জেনারের ছিল সহজাত প্রতিভা, অন্যদিকে রুগীর প্রতি ছিল তার আন্তরিক দরদ মমতা ভালবাসা।

অল্পদিনের মধ্যেই চিকিৎসক হিসাবে চারিদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ল। সেই সময় সবচেয়ে ভয়াবহ অসুখ ছিল বসন্ত। যখন কোথাও বসন্ত দেখা যেত সেই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ মারা পড়ত। তার কোন চিকিৎসা ছিল না।

কিভাবে সেই রোগ নিরাময় করা যায় সে সম্বন্ধেও কারোর কোন ধারণা ছিল না। শুধুমাত্র কিছু প্রচলিত বিশ্বাস ছিল। যারা গরুর দুধ দোয়ায় তাদের গো বসন্ত হয়, একবার কারো গো বসন্ত হলে তার আর গুটি বসন্ত হয় না। এই তথ্যের স্বপক্ষে কেউ কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।

প্রত্যেককেই বলত তারা অন্যের কাছে শুনেছে মাত্র। জেনারের কাছে অনেক বসন্তের রোগী আসত, তাদের কারো প্রাণ বাঁচাতে পারতেন না। চোখের সামনে অসহায়ের মত দেখতেন তাদের মৃত্যু। কিভাবে এই রোগ নির্মূল করা যায় সেই সময়কার খ্যাতিমান সব ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ করলেন, তাদের কেউই কোনো পথের সন্ধান দিতে পারল না।

জেনার উপলব্ধি করতে পারলেন, মৃত্যুরূপি এই ভয়ঙ্কর অসুখের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করবার কাজে তাকে সাহায্য করবার কেউ নেই। তাকে একাই এগিয়ে যেতে হবে। শুরু হল তার পড়াশুনা তিনি বিভিন্ন পুথিঁ থেকে জানতে পারলেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে চীন দেশের লোকেরা বসন্ত রোগে নিবারণের জন্য এক ধরনের টিকা ব্যবহার করত।

যার দেহে বসন্ত হয়েছে তার থেকে খানিকটা পুঁজ নিয়ে অন্যের শরীরে ঢুকিয়ে দিত। তার ফলে সুস্থ মানুষটি সামান্য পরিমাণে অসুস্থ হলেও তার আর বসন্ত হত না। কিন্তু এই কাজ করবার সময় দেখা গিয়েছিল সুস্থ লোকের দেহে বসন্তের পুঁজ ঢুকানোর ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা অসুস্থ হয়ে মারা পড়ছে।

তাই এই পদ্ধতি সাফল্য লাভ করেনি। শুরু হল জেনারের গবেষণা। বিভিন্ন রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের পুঁজ নিয়ে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। তার মনে হলো প্রচলিত বিশ্বাসের মধ্যে কোথাও কোন সত্য আছে কিনা তাও যাচাই করে দেখতে হবে।

১৭৮০ সাল নাগাদ দীর্ঘ গবেষণার পর জেনার উপলব্ধি করলেন, গো বসন্ত সম্বন্ধে যে ধারণা প্রচলিত তা আংশিক সত্য। এই গো বসন্ত সাধারণত গরুর শরীরে হয়। এতে গরুর বিশেষ কোনো ক্ষতি হয় না। বিভিন্ন ধরনের গো বসন্তের পুঁজ এনে পরীক্ষা করলেন।

দেখলেন শুধুমাত্র এক ধরনের গো বসন্তের পুঁজই গুটি বসন্তের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে কোন কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে কিনা সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না জেনার। জেনারের বাড়িতে আসত একটি গোয়ালিনী, নাম সারা নেলনিস।নেলনিস জেনারের বাড়িতে দুধ দিত।

একদিন নেলনিসের কাছে জানতে পারলেন তার বাড়ির সকলের বসন্ত হয়েছে, কিন্তু নেলনিসের কিছু হয়নি। শুধু মাত্র তার হাতে কয়েকটি ছোট ছোট গুটি বেরিয়েছে। জেনার অনুমান করতে পারলেন যেহেতু কয়েক মাস আগে নেলনিসের গো বসন্ত হয়েছে তাই গুটি বসন্ত থাকে আক্রমণ করতে পারিনি। ভাগ্যক্রমে সে সময় একটি আট বছরের মা-বাপ মরা ছেলে জেমস ফিপস তার কাছে এল। ছেলেটিকে নিজের কাছে আশ্রয় দিলেন জিনার।



যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে। বিভিন্ন শ্রেনির সকল বিষয়ে সাজেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন। নতুন নতুন সব শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বি: দ্র: তোমার নিজের রচিত কবিতা, সাহিত্য বা যেকোনো শিক্ষামূলক লেখা পাঠিয়ে দাও এডুয়েটিক’র কাছে। এডুয়েটিক প্রকাশ করবে তোমার প্রিয় লেখাটি।

এগুলো দেখুন

জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও হাসপাতালর শল্যচিকিৎসকরা একবাক্যে স্বীকার করতেন যে, একটি রোগীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *