জীবনী: হিপোক্রেটস

জীবনী: হিপোক্রেটস

মানব সভ্যতার ইতিহাসে গ্রীকদের দান অতুলনীয়। দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রেই পৃথিবীর মানুষ তাদের কাছে ঋণী। দর্শনে সক্রেটিস, প্লেটো, এ্যারিস্টেটল মানুষের চিন্তা মনীষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। এ্যাসকাইলাস, সোফাক্লিস, ইউরিপিদেস বিশ্বের নাট্য সাহিত্য ভান্ডারকে পূর্ণ করেছেন তাদের অবিস্মরণীয় সব নাটকে।

বিজ্ঞানের জগৎকে আলোকিত করেছেন হিপোক্রেটস, ইউক্লিড, আর্কিমিডিস, পিথাগোরাস। মানুষের মনের অন্ধকারের বুকে এরা জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলেন। এই সব মহান মানুষের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিপোক্রেটস। তাকে বলা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক। যে সময় তার জন্ম সেই সময় চিকিৎসা বিজ্ঞান ছিল কুহেলিকায় ঢাকা।

শুধুই কুসংস্কার আর বিচিত্র সব তন্ত্র-মন্ত্রের মধ্যেই চিকিৎসকদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিল। প্রাচীন গ্রীসদেশে চিকিৎসার দেবতা ছিলেন অ্যাপেলো। তার হাতে থাকতো দন্ড। একে বলা হতো হার্মিসের দণ্ড। এই দন্ড চিকিৎসাবিদ্যার প্রতীক। গ্রীসের বিভিন্ন স্থানে এই অ্যাপোলোর মন্দির ছিল।

লোকে অসুস্থ হলে এই মন্দিরে গিয়ে পূজা দিত, শুকুর ভেড়া উৎসর্গ করত। মন্দিরের পুরোহিতরাই প্রধানত ছিল চিকিৎসক। তারা খুশিমত চিকিৎসার নানান বিধান দিত। লোকে ভাবত দেবতার ক্রোধে মানুষ অসুস্থ হয়। পুরোহিতরা দেবতার প্রতিনিধি, তারা ইচ্ছা করলে সেই রোগ সুস্থ করে তুলতে পারে।

এভাবে এক শ্রেণীর পুরোহিত সম্প্রদায় গড়ে উঠল, চিকিৎসাই হল তাদের প্রধান পেশা। কালক্রমে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তি চিকিৎসা সম্বন্ধে তারা কিছু জ্ঞান অর্জন করল। যে যেটুকু জ্ঞান অর্জন করতো তাকে অ্যাপোলো প্রদত্ত মনে করে গোপন করে রাখত। তখন চিকিৎসাবিদ্যাকে বলা হত গুপ্ত বিদ্যা।

এই বিদ্যা শুধুমাত্র পিতা তার সন্তানকে দিত। হিপোক্রেটস ছিলেন এমনই এক চিকিৎসকের পুত্র। তিনি যে সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রায় একই সময় গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সক্রেটিস, এ্যসকাইলাস, কিছু পরে সোফোক্লিস প্লেটের মত মহান দার্শনিক নাট্যকাররা। তাদের মুক্ত স্বাধীন চিন্তা হয়তো হিপোক্রেটসকে প্রভাবিত করেছিল।

হিপোক্রেটসের জন্ম অ্যাপিয়ান সাগরের “কস” দ্বীপে। তার জীবন সম্বন্ধে বিশেষ কোনো তথ্য ও উদ্ধার করা যায় না। সামান্য যেটুকু তথ্য পরবর্তীকালে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তার ভিত্তিতে জানা যায় হিপোক্রেটসের বাবা ছিলেন কসের অ্যাপোলো মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। সেই সূত্রে সমাজে ছিল যেমন প্রভাব তেমনি প্রতিপত্তি। সুখ স্বাচ্ছন্দের মধ্যেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন তিনি।



শিক্ষার সূত্রপাত হয় তার পিতার কাছে। পিতার কাছ থেকে যাবতীয় গুপ্ত বিদ্যা তিনি অর্জন করেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই হিপোক্রেটস ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। সেই সময় একমাত্র এথেন্সে চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত কিছু পড়াশুনা হত। হিপোক্রেটস পিতার কাছ থেকে সবকিছু শিক্ষা লাভ করবার পর এথেন্সে গেলেন চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করতে।

সেখানে তার শিক্ষক ছিলেন ডিমোক্রিটাস। তিনি ছিলেন সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তি। বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন তিনটি বিষয়ই ডিমোক্রিটাসের ছিল অসাধারণ পান্ডিত্য। এছাড়াও এথেন্সের আরো কয়েকজন শ্রেষ্ঠ পন্ডিতের কাছে হিপোক্রেটস শিক্ষা লাভ করেন। সেই যুগে এথেন্স ছিল শিক্ষা সংস্কৃতির পীঠস্থান।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হতো লাইসিয়াম-এর অর্থ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। এক একটি লাইসিয়াম এক এক জন প্রখ্যাত শিক্ষকের অধীনে গড়ে উঠত। প্রত্যেক নিজের অধিগত বিদ্যা ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা জ্ঞানের সামান্য অংশই ছাত্রদের দিতেন। নিজের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানের বেশির ভাগ অংশই প্রকাশ করতেন না।

হিপোক্রেটস চিকিৎসকের পুত্র হলেও নিজের গভীর জ্ঞান, বাস্তব যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, যে যুগের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভ্রান্তি আর দোষত্রুটি। আর অবৈজ্ঞানিক দিকগুলো তার চোখের প্রকট হয়ে উঠেছিল। তিনি ঠিক করলেন বিভিন্ন চিকিৎসকদের কাছ থেকে তাদের জ্ঞানকে অর্জন করতে হবে।

কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। কারণ বেশিরভাগ চিকিৎসকই ছিলেন অহংকারী দাম্ভিক। হিপোক্রেটস তাদের অনুগত শিষ্য হয়ে নানান স্তুতি প্রশংসায় তাদের মন জয় করে নিতেন। তারপর নিজের অসাধারণ প্রতিভায় অল্প দিনের মধ্যেই গুরুর সব জ্ঞান আয়ত্ত করে নিতেন। তাছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা আসতেন।

তাদের কাছ থেকে নানাভাবে শিক্ষা অর্জন করতেন। এই ভাবে সেই যুগের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্বন্ধে পরিপূর্ণ একটি ধারণা গড়ে তুললেন এবং এর মধ্যকার ভ্রান্ত, ভুল, ত্রুটি, মিথ্যাচার, প্রতারণা কোন কিছুই তার অজানা রইল না। তিনি স্থির করলেন এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থাকে দূর করে প্রকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থা সূচনা করবেন।

তিনি তার চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত করলেন। শুরু হল রুগীর চিকিৎসা। এতদিনকার প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে এ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তখন শুধুমাত্র রোগীর রোগের উপসর্গ দেখে চিকিৎসকরা বিধান দিত। অন্য কিছু জিজ্ঞাসা বা বিচার করবার প্রয়োজন মনে করত না। কিন্তু হিপোক্রেটস বললেন, একজন প্রকৃত চিকিৎসকের উচিত রোগ নয়, রুগীর চিকিৎসা করা।

একটি উপসর্গ বা রোগ লক্ষণের উপর নির্ভর করে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়। একজন চিকিৎসকের রোগীর যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন যেমন রোগীর প্রতিদিনকার জীবনযাত্রা, পিতা-মাতা বা অন্যদের রোগের ইতিহাস, তার কাজকর্ম, কোন পরিবেশে সে বাস করে। এই সব তথ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই রোগীর সঠিক চিকিৎসা প্রণালী নির্ধারণ করতে হবে।



যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে। বিভিন্ন শ্রেনির সকল বিষয়ে সাজেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন। নতুন নতুন সব শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বি: দ্র: তোমার নিজের রচিত কবিতা, সাহিত্য বা যেকোনো শিক্ষামূলক লেখা পাঠিয়ে দাও এডুয়েটিক’র কাছে। এডুয়েটিক প্রকাশ করবে তোমার প্রিয় লেখাটি।

এগুলো দেখুন

জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার

জীবনী: জোসেফ লিস্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও হাসপাতালর শল্যচিকিৎসকরা একবাক্যে স্বীকার করতেন যে, একটি রোগীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *